সালথা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
দেশের অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল ফরিদপুরের সালথায় উৎপাদন খরচের ঊর্ধ্বগতি, বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়া এবং সংরক্ষণ সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো পেঁয়াজ চাষি। দীর্ঘদিনের এই সংকট নিরসনে এবার সরাসরি উদ্যোগ নিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন। কৃষকদের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একটি বিস্তারিত লিখিত প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন, যেখানে সমস্যা ও সম্ভাবনার পাশাপাশি টেকসই সমাধানের সুস্পষ্ট সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে।
জানা গেছে, প্রতিবেদনে পেঁয়াজ উৎপাদনের প্রতিটি ধাপের ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব সংযুক্ত করা হয়েছে। বীজ, সার, সেচ, জমির লিজ, শ্রমিকের মজুরি, পরিচর্যা, কীটনাশকসহ উৎপাদনের আনুষঙ্গিক সব খরচের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি উন্নতমানের বীজ সরবরাহ, পর্যাপ্ত সার বরাদ্দ, আধুনিক কোল্ডস্টোরেজ ও সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষকদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র সরবরাহের সুপারিশ করা হয়েছে।
শনিবার (৪ জুলাই) দুপুরে এ বিষয়ে কথা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন বলেন, "সালথার পেঁয়াজ চাষিদের সমস্যাগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আশা করছি, প্রয়োজনীয় সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাবেন এবং উৎপাদন আরও বাড়বে।"
উপজেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সালথার ১৪ হাজার ৯৫০ হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়। উর্বর মাটি ও অনুকূল আবহাওয়ার কারণে বহু বছর ধরে এ উপজেলা ফরিদপুর জেলার সর্বোচ্চ পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
তবে উৎপাদন বাড়লেও লাভের মুখ দেখছেন না কৃষকরা। তাদের হিসাবে, প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৫ টাকা ১৫ পয়সা, অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ২২ টাকা ৫০ পয়সা দরে। অর্থাৎ প্রতি কেজিতে প্রায় ২ টাকা ৬৫ পয়সা লোকসান গুনতে হচ্ছে। ফলে অনেক কৃষক ঋণের বোঝা নিয়ে নতুন মৌসুমের চাষ নিয়েও অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
এদিকে উন্নতমানের বীজের সংকট, পর্যাপ্ত সারের অভাব, সময়োপযোগী কৃষি প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় স্প্রে মেশিনসহ আধুনিক কৃষিযন্ত্রের স্বল্পতাও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
সংরক্ষণ সংকটকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন তারা। পর্যাপ্ত কোল্ডস্টোরেজ ও আধুনিক সংরক্ষণাগার না থাকায় অধিকাংশ কৃষক মৌসুমেই বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করে দেন। এতে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার সম্ভাব্য লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
কৃষকদের দাবি, উন্নতমানের বীজ সহজলভ্য করা, প্রয়োজন অনুযায়ী সার সরবরাহ নিশ্চিত করা, আধুনিক সংরক্ষণাগার ও কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, নিয়মিত কৃষি প্রশিক্ষণ এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র সরবরাহ করা হলে উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি কৃষকরাও ন্যায্য লাভ নিশ্চিত করতে পারবেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সালথার মতো সম্ভাবনাময় পেঁয়াজ উৎপাদন অঞ্চলের সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা গেলে দেশের পেঁয়াজ উৎপাদনে নতুন গতি আসবে। এতে একদিকে যেমন আমদানিনির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, বাজার স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
স্থানীয় কৃষকদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের এ উদ্যোগ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সালথার পেঁয়াজ চাষে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।