কুড়িগ্রামের রাজারহাটে নাজিমখান ইউনিয়নের ঝাড়িঝাড় গ্রামে একটি সেতু প্রায় এক বছর ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। সেতুর নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে তলদেশে ভাঙন এবং সংযোগ সড়কে বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা মাটি ফেলে কোনোভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করলেও সেতুর ওপর দিয়ে মোটরসাইকেল কিংবা অটোরিকশা চলাচলের সময় সেটি কেঁপে ওঠে। ফলে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে সেতুটি দিয়ে পারাপার করছেন আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সেতুর এক পাশে সংযোগ সড়কের মাটি সরে গিয়ে ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙা অংশে স্থানীয়রা মাটি ফেলে সাময়িকভাবে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। তবে ওই পথও নড়বড়ে। সেতুর ওপর দিয়ে ছোট যানবাহন বিশেষ করে মোটরসাইকেল চলাচলের সময় সেটি কেঁপে ওঠে। ভারী যানবাহন চলাচল প্রায় বন্ধ থাকলেও প্রয়োজনের তাগিদে সাইকেল, অটোরিকশা ও পথচারীরা ঝুঁকি নিয়েই পার হচ্ছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাজিমখান ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ঝাড়িঝাড় গ্রামের হাসারপাড় এলাকায় তিস্তা নদী থেকে বুড়ি তিস্তা নদীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনকারী একটি নালা পুনঃখনন করা হয়। নালা খননের সময় সেতুর দুই পাশ থেকেও মাটি কেটে নেওয়া হয়। পরে তিস্তা নদীর পানি ও স্রোত বাড়লে সেতুর নিচের তলদেশ থেকে মাটি সরে যেতে শুরু করে। একপর্যায়ে সেতুটি দেবে যায় এবং নিচে ভাঙনের সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে সেতুর সঙ্গে সংযোগ সড়কেও ভাঙন দেখা দেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় এক বছর ধরে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও এখন পর্যন্ত সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিনই দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে সেতুটি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
এই সেতু দিয়ে প্রতিদিন নাজিমখান বাজারে যাতায়াত করেন ঝাড়িঝাড়, ছড়ারপাড়, কুটিপাড়া, পলাশপুর ও হাসারপাড় গ্রামের মানুষ। বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার মানুষও এই পথ ব্যবহার করেন। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১৫ হাজার মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম সেতুটি।
সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিক্ষার্থী, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। রাঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড়বাড়ি দাখিল মাদ্রাসা, বাছড়া আজিজিয়া আলিম মাদ্রাসা ও শরফ উদ্দিন মহিলা দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নিয়মিত এই সেতু দিয়ে যাতায়াত করতে হয়।
ঝাড়িঝাড় গ্রামের বাসিন্দা রহিমা বেগম (৭০) বলেন, খাল খননের কারণে আমাদের ভিটের মাটিও ভেঙে গেছে। এখন আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছি। আমি তো বুড়ো হয়ে গেছি। সেতু দিয়ে হাঁটলে মনে হয়, ঠিকমতো ওপারে যেতে পারব তো? সেতুর ওপর থাকা অবস্থায় যদি ভেঙে পড়ে, তাহলে তো মারা যাব।
কুটিপাড়া গ্রামের আতিয়ার রহমান (৪০) বলেন, একটা সাইকেল গেলেই সেতু কেঁপে ওঠে। তাই সাইকেল নিয়ে হেঁটেই পার হই। সেতু পার হওয়ার সময় বুক ধড়ফড় করে। কখন কী হয়, সেই ভয় থাকে।
স্থানীয় শিক্ষার্থী শরীফুল ইসলাম (১২) বলে, আমি প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে মাদ্রাসায় যাই। সেতু পার হওয়ার সময় খুব ভয় লাগে। মনে হয়, কখন যেন ভেঙে যায়।
নাজিমখান ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য লালমিয়া সরকার বলেন, ‘সেতুটির কারণে এলাকার মানুষের যাতায়াতে অনেক অসুবিধা হচ্ছে। ভারী যানবাহন চলাচল করতে না পারায় মালামাল আনা-নেওয়াতেও সমস্যা হচ্ছে। সেতুটির কাজ দ্রুত বাস্তবায়ন করা দরকার।’
নাজিমখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক পাটোয়ারী নয়া বলেন, ‘সেতুটির অবস্থা খুবই নাজুক। সাইকেল কিংবা অটোরিকশা উঠলেই সেতুটি কেঁপে ওঠে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাঙা সংযোগস্থলে মাটি ফেলে কোনোভাবে মানুষ পারাপার করছে। বিষয়টি এলজিইডিকে জানানো হয়েছে, তারাও এসে সেতুটি দেখে গেছেন। দ্রুত সংস্কার না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।’
রাজারহাট উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুর রশীদ মন্ডল বলেন, ‘সেতুটির সার্ভে হয়েছে এবং সয়েল টেস্টও করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া আছে। রাজারহাট উপজেলায় এ ধরনের ১৭টি সেতুর মধ্যে এই সেতুটিরই শুধু সয়েল টেস্ট হয়েছে। বর্তমানে বিষয়টি কোন অবস্থায় আছে, তা খোঁজ নিয়ে জানতে হবে।’