নজরুল ইসলাম লিখন, রূপগঞ্জ
বর্ষা শুরুর সঙ্গে সঙ্গে দেশে ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ বেড়েছে। ডেঙ্গ, চিকুনগুনিয়া এবং কোভিড-১৯-এর নতুন ভ্যারিয়েন্টের সংক্রমণ বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। আর এই তিন রোগের সংক্রমণ শুরু হয় জ্বর দিয়ে।
রূপগঞ্জ উপজেলা আবাসিক সার্জন ডা. অরূপ রতন নাহা বলেন, করোনায় কাশি ও শ্বাসের টান থাকে, ডেঙ্গু ও চিকোনগুনিয়াতে কাশি বা শ্বাসের টান সাধারণত থাকে না। করোনাতে গলাব্যথা থাকতে পারে কিছুটা, চিকোনগুনিয়াতে আবার গলাব্যথা থাকে না।
অন্যদিকে করোনাতে নাকে গন্ধ এবং মুখে স্বাদ না-ও পেতে পারে। কিন্তু চিকোনগুনিয়া বা ডেঙ্গুতে এটি হয় না। চিকোনগুনিয়াতে শরীরের জয়েন্টে এত বেশি ব্যথা হয় যে, অনেক সময় আক্রান্ত ব্যক্তি নিজে হাঁটতে পারে না, কাউকে ধরে তাকে হাঁটাতে হয়।
ডেঙ্গুতে ব্যথা হয় কিন্তু তীব্র ব্যথা হয় না। চিকোনগুনিয়া ও ডেঙ্গুতে রোগী প্রচ- দুর্বল বোধ করে, সে তুলনায় করোনায় প্রথম দিকে দুর্বলতা কম থাকে এবং কাশি, শ্বাসের টান কম থাকে।
সারা দেশেই এখন ডেঙ্গু ও করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। প্রকৃতিতে এখন বর্ষাকাল চলছে। এই বৃষ্টি , এই রৌদ। আকাশে সারাক্ষনই মেঘ আর রোদের খেলা চলে। এমন আবহাওয়ায় কখনও ঠান্ডা আবার কখনও শীতল। ময়লা পানির কারনে গোটা রূপগঞ্জ জুড়েই রয়েছে মশার উপদ্রব।
এমন পরিবেশে বাড়ছে জ্বর, সর্দি-কাশি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা। রোগী বেড়ে যাওয়ায় হিমশিম অবস্থা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের। সরকারি হিসেবেই উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ জ্বর ও সর্দি-কাশি আক্রান্ত ২ শতাধিক মানুষ।
বর্ষার এ সময়টাতে ডেঙ্গু করোনা আতঙ্কে দিশেহারা রূপগঞ্জের মানুষ। পরিবারের কারো শরীরে জ্বর অনুভব হলেই সবাই আঁতকে উঠছে। ডেঙ্গু মশার কামড়ে হলেও কার্যত মশক নিধনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এ উপজেলায়।
সরেজমিনে ঘুরে লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডেঙ্গু ও করোনা নিয়ে লোকজনের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে।যারা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে তারা এটাকে টাইফয়েড জ্বর হিসেবে ভেবে নিয়েছে। আর যারা এ রোগের ব্যাপারে অবগত রয়েছেন তারাও খুব চিন্তায় রয়েছেন। পরিবারের কারো শরীরে সামান্যতম জ্বর দেখা দিলেই সবাই আঁতকে উঠছেন।
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বিভিন্ন বেসরকারী হাসপাতাল, ক্লিনিক ও মেডিকেল ফার্মেসীগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হঠাৎ করেই রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ভাইরাস জ্বরের প্রকোপ দেখা দিয়েছে।
প্রতিদিনই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ বেসরকারী হাসপাতালগুলোতে জ্বরের রোগীর প্রচন্ড ভীড় বাড়ছে। হাসপাতালগুলোর তথ্যমতে, প্রতিদিন রূপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত জ্বরের রোগী ভীড় করছে। এদের কেউ এক সপ্তাহ, কেউ ৫ দিন, কেউ ৩ দিন, কেউবা দুইদিন ধরে জ্বরে ভুগছে।
হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ৫ জন করে জ্বরের রোগী ভর্তি হচ্ছে। সে হিসেবে উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ১২ টি বেসরকারী হাসপাতালে প্রায় ২শ’ রোগী ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া পাড়া-মহল্লার ফার্মেসীগুলোতে জ্বরের রোগীদের প্রতিদিন ভীড় জমে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কথা হয় জ্বরে আক্রান্ত স্কুল পড়–য়া রাতুল(৬) মা প্রিয়া রানীর সাথে। তিনি বলেন, তার ছেলে গত ১৫ দিন ধরে জ্বরে ভুগতেছে। প্রথমে এলাকার ডাক্তার দেখিয়েছেন। কিন্তু কাজ না হওয়ায় ৬ দিন আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছেন।
করোনা ও ডেঙ্গুর ভয়ে সে তার ছেলেকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। তিনি আরো বলেন, টিভির খবরে হুনছি করোনা ডেঙ্গু জ্বর নাকি অয় এহন। হের লেইগ্যা ডরে ( ভয়ে ) হাসপাতাল আনছি। আমাগো দিকেতো ঘরে ঘরে জ্বর। মানুষ এহন ডেঙ্গু করোনা নাম হুইনাই ডরায়।
ছনপাড়া এলাকার আনোয়ার হোসেন ১০/১২ দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত। হাসপাতাল এসে ভর্তি হয়েছেন। ডেঙ্গু বা করোনা হয়েছে কি-না জিজ্ঞেস করতেই বলেন, জ্বর সারতেছে না, তাই ভর্তি হইছি। জীবনে কতো জ্বর অইলো। কোনদিনতো হাসপাতাল আহি নাই।
পেড়াবো থেকে মায়ের সাথে এসেছেন আট মাসের আরফান। আরফানের মা শরমী সুলতানা বলেন, গত কয়েকদিন ধরেই ও জ্বরে ভুগছে। প্রথমে টেনশন করিনি।
যখন দেখলাম জ্বর ছাড়ছেনা তখন বাধ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি করাই। কারণ সারাদেশে এখন ডেঙ্গু জ্বরের খবর পাওয়া যাচ্ছে। তাই মনে ভয় দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, বিরূপ আবহাওয়া না শীত, আবার না গরম-এমন এক ধরনের বিরূপ পরিবেশের কারণে জ্বর-সর্দি-কাশির প্রকোপ বেড়েছে।
আর হাসপাতালে আসা রোগীদের মধ্যে জ্বর-সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, হাঁপানি, নিউমোনিয়া, ব্রংকিওলাইটিস, টাইফয়েড ও পানিবাহিত হেপাটাইটিস ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়া রোগী বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
তারা জানান, সাধারণ জ্বর হলে দুই-তিন দিনের মধ্যে এমনই সেরে যায়। কিন্তু তার চেয়ে বেশিদিন জ্বর থাকলে অবহেলা না করে ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হবে।
ডাঃ অরূপ রতন নাহা বলেন, শিশুদের সর্দি-জ্বর এবং শ্বাসজনিত মৌসুমি রোগবালাই থেকে বাঁচতে বাড়তি সতর্কতা ও সচেতনতা বাড়ানোসহ ঘরের ফ্যান, দরজা-জানালা বন্ধ ও ঠান্ডা পানি খাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে। আর ঠান্ডা লাগলে শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাসের দিকে নজর রাখতে হবে।
বেশি করে পুষ্টিকর খাবার, ফলমূল ও কুসুম গরম পানি খেতে হবে। একই সঙ্গে বাইরে গেলে ধূলাবালি এড়িয়ে চলতে হবে। কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের ওষুধ খাওয়া যাবে না।
শিশুদের পোশাক হতে হবে নরম এবং ঢোলা ও আরামদায়ক। আর সর্দি-জ্বরে যারা আক্রান্ত হবেন তাদের পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশ্রাম নিতে হবে। প্রচুর তরল ও পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবারসহ তাজা ফলমূল শাকসবজি খেতে হবে ও সতর্কতার সঙ্গে চলতে হবে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাঃ আইভী ফেরদৌস বলেন, করোনা ডেঙ্গু নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। সবাইকে সচেতন হতে হবে। মশার বিস্তার ধ্বংস করতে হবে। তিনি আরো বলেন, ঋতু পরিবর্তনের ফলে ঠান্ডা, জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাই এখন বেশি। শিশু ও বৃদ্ধরাই আক্রান্ত হচ্ছেন বেশি।
প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই’শ রোগীকে আউটডোরে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীও আসছে। কাউকে ফেরত দিচ্ছি না আমরা। সাধ্যমত চিকিৎসা সেবা দিচ্ছি। বেড সঙ্কট থাকায় এক বেডে ডাবল রোগী এবং ফ্লোরে রেখেও চিকিৎসা দিয়েছি আমরা।